× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ২

সবুজ খুঁজে বেড়াই

সীমান্ত দীপু

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১২:১২ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১৭ এএম

সীমান্ত দীপু

সীমান্ত দীপু

আমাদের লাল-সবুজ পতাকার রঙটা মনের ভেতর অসাধারণ এক অনুভূতি এনে দেয়। রক্তলাল রঙটা মানুষের আত্মত্যাগের চিহ্ন। এ পতাকার জন্য যা আর কখনই করতে হবে না। সবুজ রঙটা আমাদের প্রিয় বাংলার প্রতীক। সহজেই এ দেশটার সঙ্গে মিলে যায়। আমাদের জনপথটা চোখ জুড়ানো অপরূপ সবুজ আর সুন্দর। এতই সবুজ যে অন্য অঞ্চল বা দেশের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলানো যায় না।

স্বাধীনতার পর সবার প্রচেষ্টায় দেশটার শুধু উন্নতিই হয়েছে। সড়কের উন্নতি, শিক্ষার উন্নতি, মানুষের জীবনমানের উন্নতিসহ আরও অনেক কিছু। বেশিরভাগ অজপাড়াগাঁও হয়ে গেছে বেশ উন্নত গ্রাম আর উন্নত গ্রাম এখন প্রায় শহরে পরিণত হয়েছে। আমাদের সরকারেরও ইচ্ছে তাই। প্রতিটি গ্রামেই থাকবে শহরের ছোঁয়া। আর এত কিছুর ভিড়ে আমাদের সবুজ বাংলাটা হয়ে পড়ছে ফ্যাকাশে সবুজ। বাংলা তার সবুজ নির্মল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিন দিন হারিয়ে ফেলছে।

এক যুগ আগে টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি দেখতে গেলাম। হাওরজুড়ে কয়েক লাখ পরিযায়ী হাঁস। খালি চোখে বুঝতে পারি হাঁসগুলো গিজগিজ করছে। কিন্তু দুরবিনে চোখ লাগিয়ে কেমন জানি অস্পষ্ট লাগল পাখিগুলো। ঢাকায় ফিরে এসে প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ড. নিয়াজ আবদুর রহমানের পরামর্শ নিলাম। তিনি বললেন, শুধু প্রার্থনা করুন আর বেশি বেশি সবুজ দেখুন। তার কথায় চমকে উঠলাম। ঢাকার কনক্রিটের এ জঙ্গলে কীভাবে সবুজ দেখতে পাই। তার কথামতো যখনই সুযোগ-সময় পাই বেরিয়ে পড়ি দুই চোখ ভরে সবুজ দেখতে। কিন্তু এ শহরে যারা বেড়ে উঠছে তারা হয়তো বুঝতেই পারছে না সবুজ রঙটা আমাদের চোখের আর মনের প্রশান্তির জন্য কতটা জরুরি! সবুজ বাংলাদেশ না থাকলে মানুষ হিসেবে আমাদের টিকে থাকা এ বিরূপ পরিবেশে আসলেই কঠিন হয়ে পড়বে।


সবুজ বন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। সব ধরনের গবেষণা এমনটাই বলছে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই। গাজীপুরের বিশাল শালবনটা এখন আর নেই। সবই বণিজ্যিক কলকারখানার দখলে। এ শালবনেই শতবছর আগে ছিল বাংলার বাঘ আর বুনো ময়ূর। এখন এসব বনে গেলে মনে হয় একটা খটখটে পিকনিক স্পট। মাত্র এক শতকেই একটি গহিন বন আমরা পুরোটা শেষ করে ফেলেছি। এ রকম অবস্থা প্রায় সব বনেরই। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে শুধু উঁচু উঁচু ন্যাড়া পাহাড় দেখি, মাতৃগাছগুলো আর চোখে পড়ে না। বড় বড় পাহাড়ে এখন জুম চাষ আর ফলবাগানের সমারোহ। এমনকি এই তো কদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আধুনিক রেলপথ তৈরি হলো আমাদের সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে!

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে আমাদের খুব বেশি ভূমি নেই। তারপর আবার আমাদের এক ইঞ্চি অনাবাদি জমি ফেলে রাখা যাবে না যা সরকারিভাবেই বলা হচ্ছে। বন আর সবুজ আচ্ছাদনের সংরক্ষণের কথা কাগজে কলমেই বেশি চলে। শুধু এ দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এমনটা দেখা যায়। পৃথিবীব্যাপী দিনে গড়ে ৪১ মিলিয়ন গাছ কাটা হয় আর প্রায় ৭ মিলিয়ন হেক্টর বন তথা সবুজ ধ্বংস হয় প্রতি বছর। অথচ এর বিপরীতে বনায়ন তৈরির চেষ্টা একেবারেই কম। আইইউসিএন লাল তালিকা অনুযায়ী গোটা দুনিয়ায় প্রায় ২৮ ভাগ বন্য প্রাণী বিলুপ্তির সম্মুখীন। বাংলাদেশে এর পরিমাণ আরও বেশি। প্রায় ৩০ ভাগ। আর বৃক্ষকুল বিলুপ্তির পথে আছে ৪০ ভাগের ওপরে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ দেশের মোট ভূমির প্রায় ৩০ ভাগ বন থাকবে এমন এক অঙ্গীকারে বৈশ্বিকভাবে আমাদের সরকার স্বাক্ষর করেছে। অথচ আমাদের দেশে সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৬.৭ ভাগ আর সবুজ আচ্ছাদন বিবেচনা করলে তা হয়তো হবে ১৩ ভাগ। আর মাত্র সাত বছরে এ লক্ষ্য পূরণ করার ধারেকাছেও আমরা নেই। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার বৈশ্বিকভাবে অঙ্গীকার করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে এ দেশে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর বন পুনরুদ্ধার করবে। এখন পর্যন্ত এর পরিমাণ মাত্র ১ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর। অথচ উন্নত দেশ হওয়ার একটি বড় নিরূপক হলো সবুজায়ন। মানুষের উন্নয়নের পাশাপাশি সবুজায়ন না হলে মানুষ সমস্যায় বাড়বে বেশি।

গোটা পৃথিবীর তিন ভাগের এক ভাগ সবুজের আচ্ছাদন থাকার কথা যার পরিমাণ প্রায় ৪.০৬ বিলিয়ন হেক্টর। এ পরিমাণ চিন্তা করলে এখন প্রতিটি মানুষের জন্য সবুজের পরিমাণ হয় ০.৫ হেক্টর। কিন্তু সব দেশে এ সবুজায়ন এক সমান নয়। পৃথিবীর বৃহৎ পাঁচটি দেশ রাশিয়া, কানাডা, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিলে মোট বনের প্রায় ৫৪ ভাগে আছে আর বাকি পৃথিবীতে আছে ৪৫ ভাগ। আর গোটা দুনিয়ায় প্রাকৃতিক বনের পরিমাণ প্রায় ৯৩ ভাগ। আর সারা পৃথিবীর সব মানুষের প্রচেষ্টায় আমরা বন তৈরি করতে পেরেছি মাত্র ৭ ভাগ।

এত কিছুর ভেতরও আমাদের দেশে সবুজ বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। এই ধরুন আমাদের সুন্দরবন। ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে একখণ্ড সবুজের সমারোহ। এ বন বাঘসহ শত শত প্রজাতির প্রাণীর বড় এক অভয়ারণ্য। বলা যায়, এ দেশে বন্য প্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল।

এ দেশের উপকূলজুড়ে আছে এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বিশ্বের সবচেয়ে সফলতম বাদাবন এ অঞ্চল গড়ে ওঠে মাত্র চার যুগে। পুরো অঞ্চলের নাম সবুজ বেষ্টনী। বন অধিদপ্তরের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলের মানুষের রক্ষাকবচ। এ বনগুলো মানুষকে রক্ষা করে বিধায় মানুষ হয়তো এ কারণেই বনগুলো ধ্বংস করে না। অন্যদিকে আছে উত্তরাঞ্চলের সামাজিক বনায়ন। ঘরের উঠানে মানুষ এখন গাছ লাগানো শিখেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর তিনটি করে গাছ লাগিয়ে এ আন্দেলন আরও বেগবান করতে উৎসাহ দেন।

সব সমস্যা পেছনে ফেলে আমাদের মনটা সব সময় সবুজের পেছনে পেছনে ছোটে। আর আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সবুজ রক্ষা করা খুবই কঠিন। সরকারিভাবে সবচেয়ে বড় কাজ হবে যদি আমাদের মোট ভূমির মাত্র ৭ ভাগ যে নিরাপদ বনভূমি ঘোষণা করা হয়েছে তা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা যায়। সুন্দরবন, উপকূলীয় বন আর টাঙ্গুয়ার হাওরের মাত্র কিছু অঞ্চল সংরক্ষণের জন্য সত্যিকারের জন্য ছেড়ে দিলে রক্ষা পাবে দেশের বেশ বড় অংশের প্রানিকুল। নাগরিক হিসেবে নিজের ভিটেমাটির সামান্য অংশে হলেও কটি গাছ লাগিয়ে রাখুন। শহরে মানুষের বারান্দায় অথবা জানালার পাশে একটি হলেও দেশি গাছ রাখুন। সবুজে দেশটা সবুজ থাকুক আর সবুজ খোঁজার মানুষ দিন দিন বাড়ুক।

  • বন্য প্রাণী গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা