× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দালালের ‘সেবায়’ জিম্মি রোগী

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:০৮ পিএম

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:৩৮ পিএম

কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যতম ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালটি কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে চিহ্নিত দালাল চক্র। এই দালাল চক্রের প্রায় ১০০ সদস্যের কাছে জিম্মি হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স থেকে শুরু করে কর্মচারীরাও। কতিপয় চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীর সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে সম্প্রতি এই চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। এতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। জেলার প্রান্তিক এলাকা থেকে আসা রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। আর চিকিৎসার নামে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন তারা। সর্বস্ব হারিয়ে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিতও হচ্ছেন কেউ কেউ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৩ উপজেলার অন্যতম চিকিৎসা কেন্দ্র কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় এক হাজার ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে ও আন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০ জন বহির্বিভাগে এবং ৩৫০ জনের মতো ভর্তি থাকে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোগীরা হাসপাতালে আসার পর দালাল চক্রের দাপটে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়ে। চক্রটি নানা কৌশলে রোগী ও তার স্বজনদেরকে প্রতারিত করে। বিশেষ করে জটিল রোগীর স্বজনের কাছে এই চক্রের সদস্যরা গায়ে পড়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। কখনও বাইরের ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে দেওয়ার নাম করে, আবার কখনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে রোগীর স্বজনদেরকে সর্বস্বান্ত করছে। 

এই চক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কতিপয় চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মচারীও প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ। হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা কিংবা ময়মনসিংহে রেফার করা হলে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পাওয়া যায় না। দালাল চক্রের সঙ্গে সমঝোতায় না এলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়াও সম্ভব হয় না। অপারেশনের সময় নার্সদের সঙ্গে গোপন রফার বিনিময়ে এই চক্রের সদস্যরা রোগীর স্বজনকে বাইরের ফার্মেসি থেকে দামি ওষুধ কিনে আনার স্লিপ দেন। সেই স্লিপ অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকায় ওষুধ বা অপারেশনসামগ্রী কিনে এনে নার্সের হাতে দেওয়ার পরে অধিকাংশ ব্যবহার না করে বাইরে বিক্রি করে দেন। প্রসূতি মায়েদের সিজার করার সময়ও এই চক্র নানা খরচের অজুহাত দেখিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ছাড়া নবজাতক জন্মের পর নার্সেরা বকশিশ বাবদ টাকা দাবি করেন। না দিলে প্রসূতি ও নবজাতকের প্রতি তাদের অবহেলার মাত্রা বেড়ে যায়। 

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপতালে দালাল চক্রের সদস্যরা কোনো কোনো চিকিৎসকের কক্ষে দীর্ঘ সময় আড্ডা দেন। তাদের উপস্থিতির কারণে গ্রাম থেকে আসা রোগীরা চিকিৎসা নিতে পারেন না। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দালাল চক্র রোগীদের নানা প্রলোভনে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। 

সম্প্রতি সদর উপজেলার বৌলাই থেকে আসা রোগী মাকসুদা বেগম ও তার আত্মীয়কে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে এক দালাল হাসপাতাল সংলগ্ন একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। পরে প্যাথলজি পরীক্ষার নামে তার কাছ থেকে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা হাতিয়ে নেন। একই অভিযোগ করেন সগড়া গ্রামের এমদাদ হোসেন। তার স্ত্রী জোয়েনাকে কম টাকায় সিজার করে দেওয়ার কথা বলে একটি ক্লিনিকে নিয়ে ১৫ হাজার টাকার বিল করে। পরে ওই টাকা থেকে দালাল তিন হাজার টাকা নিয়ে নেয়। এমদাদ হোসেন দুঃখ করে বলেন, ‘এই অবস্থা চলছে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে।’

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি মায়া ভৌমিক বলেন, জেলার প্রধান হাসপাতাল হিসেবে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। ভিড় আর অব্যবস্থার মধ্যে দালাল চক্র অপতৎপরতা চালিয়ে যায়। হাসপাতালে কর্মরত বেশ কিছু চিকিৎসক অধিক আয়ের উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে গোপন যোগসাজশে লিপ্ত বলে রোগীরা অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে একাধিকবার স্বাস্থ্য প্রশাসনকে অবহিত করা হলেও বাস্তবে এই চক্রকে দমন করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। হাসপাতালে কর্মরত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা নির্ধারিত ইউনিফর্ম ব্যবহার করেন না বলে সাধারণ রোগীরা দালাল এবং কর্মচারীকে চিহ্নিত করতে পারেন না। ফলে দালালদেরকে হাসপাতালের কর্মচারী ভেবে নিয়মিত প্রতারণার শিকার হচ্ছে।’ 

গত এক দশকে মাত্র একবার হাসপাতালে দালালদের অপতৎপরতা বন্ধের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৫ জন দালালকে আটক করেন। পরে তাদেরকে জেল-জরিমানা করেন। এরপর কিছুদিন এই চক্রের অপতৎপরতা থেমে থাকলেও এখন জোরেশোরেই তারা মাঠে নেমেছে। দালাল চক্রের সদস্যদেরকে রোগীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে জরুরি বিভাগ ও বিভিন্ন ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। 

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সদর উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামের গৃহিণী বেবিনাজ বেগম, মহিনন্দ গ্রামের রহিমা আক্তারসহ একাধিক রোগী জানান, দুজন দালাল তাদেরকে হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা নেই বলে নিকটবর্তী একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তারা রাজি না হওয়ায় চক্রের সদস্যরা তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। 

দালালদের মধ্যে মহরম আলী, রমজান মিয়াসহ কয়েকজন বলেন, ‘রোগীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকি। বিনিময়ে কিছু টাকা পাই। তা ছাড়া দালালি তো একটি ব্যবসা। জমি কিনে কিংবা বিক্রি করে দিলে দালালি হিসেবে টাকা পাওয়া যায়। আমাদের কাজটিকে এত নেতিবাচকভাবে দেখা ঠিক না।’

দালাল চক্রের প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘রোগীদের প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সপ্তাহে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করলে অবস্থার পরিবর্তন হবে।’ 

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক নূর মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে দালাল পেয়েছি। তবে তাদের তৎপরতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক কম।’ হাসপাতালে তিনি একটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির দাবি জানান। এ ছাড়া দালালদের তৎপরতা বন্ধ করতে বিভিন্ন ওয়ার্ডসহ পুরো হাসপাতাল প্রতিদিন পরিদর্শন করেন বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা