× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শতবর্ষের দুয়ারে সাবির আহমেদ

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:৪৫ পিএম

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:২৬ পিএম

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাবির আহমেদ চৌধুরী। প্রবা ফটো

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাবির আহমেদ চৌধুরী। প্রবা ফটো

শতবর্ষের দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাবির আহমেদ চৌধুরী। ১৯২৪ সালের ১৫ জুলাই নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার হাড়িসাংগান গ্রামে জন্ম নেন তিনি। তার মা আসিয়া খাতুন, বাবা হানিফ মোহাম্মদ। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, সাহিত্যিক, মানবতাবাদী কবি ও গীতিকার। 

সাবির আহমেদ চৌধুরীর স্ত্রী নার্গিস চৌধুরী জানান, শতবর্ষী মানুষটি বর্তমানে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। ২০২২ সালে প্রথম ব্রেইন স্ট্রোক হয় তাঁর। তখন দেড় মাসের মতো হাসপাতালেই চিকিৎসা নেন তিনি। তারপর গত প্রায় ১৪ মাস ধরে বাসাতে বেশ ভালোই ছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার ঠাণ্ডা লেগে কাশি হয়ে যায়। ২৫ জানুয়ারি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। ২৬ জানুয়ারি আবার হার্ট অ্যাটাক হলে সপ্তাহখানেক রাখা হয় সিসিইউতে। ব্রেইন স্ট্রোক, হার্টের সমস্যা, কিডনি ইনফেকশনসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত এই ভাষাসংগ্রামী বর্তমানে স্কয়ার হাসপাতালে ডা. ফজলে রাব্বীর অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নার্গিস চৌধুরী দেশবাসীর কাছে সাবির আহমেদ চৌধুরীর জন্য দোয়া চেয়েছেন। 

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি স্কয়ার হাসপাতালে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা যায়, সাবির আহমেদ চৌধুরী মুখ দিয়ে কিছু খেতে পারছেন না। নল দিয়ে খাবার দিলেও কাশির মাত্রা বেড়ে যায় তার। তাই খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে ইনজেকশনের সাহায্যে। 

ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ

সাবির আহমেদ চৌধুরী ১৯৪৭ সালে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বর্তমান বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন ১৯৪৮ সাল থেকেই সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। সেখানে উপস্থিত অন্য ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও এ ঘোষণার প্রতিবাদ জানান।

পরবর্তী সময়ে সাবির আহমেদ কর্মস্থলে থেকেও ভাষা আন্দোলন জোরদার করতে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় সশরীরেও অংশ নেন। তবে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গের আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন না। পত্রিকায় একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলি চালানোর সংবাদ পড়ে কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ঢাকা চলে আসেন এবং ভাষাসংগ্রামীদের খোঁজখবর নেন। বিভিন্ন মিছিলে অংশ নেওয়া ছাড়াও আহতদের চিকিৎসায় সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন তিনি।

আন্দোলনের স্মৃতি 

বর্তমানে সাবির আহমেদ চৌধুরী কোনো সাক্ষাৎকার দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে ইতঃপূর্বে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে বহু দেশ স্বাধীন হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সেসব দেশের পার্থক্য হচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের দিকে এগিয়ে গেছি। ফেব্রুয়ারিকে শোকের মাস বলা হলেও এ মাসের অনুপ্রেরণা ও প্রাপ্তি অনেক। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটি একটি বিরাট পাওয়া। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ধাপ। ‘জাতির জীবনে অনন্য এক এই একুশে ফেব্রুয়ারি/পৃথিবীর মধ্যে প্রথম দিয়েছি রক্তসাগর পাড়ি’ অর্থাৎ পৃথিবীতে ভাষার জন্য প্রথম রক্ত দেওয়া জাতি আমরা। আর পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার আগেও দেশটি ছিল ব্রিটিশদের উপনিবেশ। সেই সময় থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীন একটি ভূমির জন্য নানা সময়ে লড়াই-সংগ্রাম করেছে। আমি নিজেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। তারপর পাকিস্তান আন্দোলনেও যুক্ত ছিলাম।’

সাবির আহমেদ চৌধুরী ওই সাক্ষাৎকারে আরও বলেন, ‘কিন্তু ১৯৪৭ সালে যে পাকিস্তান পেলাম তা আমাদের স্বপ্নকে নস্যাৎ করেছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এলেন। তখন আমি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। বন্ধুরা মিলে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ভাষণ শুনতে গেলাম। সেখানে তিনি ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এমনকি এটাও বললেনÑ যারা এর বিরোধিতা করবে, তারা শত্রু হিসেবে গণ্য হবে। এটি আমাদের প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমরা এটার প্রতিবাদ করলাম। তখনই বুঝে গিয়েছিলাম আমাদের অন্যকিছু করতে হবে। আর সেই ক্ষোভ থেকেই ধীরে ধীরে আমরা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হয়ে পড়ি। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরপরই তমদ্দুন মজলিস বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যে একটি প্রচারপুস্তিকা প্রকাশ করে। পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অধিবেশনের সকল কার্যাবলি ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও লিপিবদ্ধ করার দাবি তোলেন। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেও কথা বলেন তিনি। কিন্তু সরকার এসব কথায় কান দেয়নি। এমনকি আরবি অক্ষরে বাংলা লেখার চেষ্টাও করা হয়।’

ভাষাসংগ্রামী সাবির বলেন, ‘এভাবে যখন বাংলা ভাষার ওপর একের পর এক আঘাত আসতে থাকে, তখন আমরা আর বসে থাকতে পারিনি। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের আন্দোলনে সচিবালয় ঘেরাও করা হয়। সেখানে অনেককেই পুলিশ লাঠিপেটা করে। আবার অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি করে কয়েকজনকে হত্যা করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহিদ মিনার ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে যে মিছিল হয়েছিল, ঢাকায় সেই মিছিলে আমিও অংশ নিয়েছি। এভাবে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাষার অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছি।’

মুক্তিযুদ্ধেও রয়েছে সাবির আহমেদ চৌধুরীর অবদান। তার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যশোর ক্যান্টনমেন্টের ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে জড়িত ছিল। যা নির্মাণের পর ৩০ জুনের মধ্যে সেনাবাহিনীকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। এটিকে তিনি একটি সুযোগ হিসেবে নেন এবং ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রমিক হিসেবে অবস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। এ ছাড়া তিনি পুরো ক্যান্টনমেন্টের লে-আউট সংগ্রহ করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সরবরাহ করেন। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যান্টনমেন্ট দখল করার পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়।

নানামুখী পদচারণা

সাবির আহমেদ চৌধুরী ১৯৪৮ সালে সিঅ্যান্ডবি বিভাগে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে চাকরি ছেড়ে ১৯৫৪ সালে ‘সাবির আহমেদ চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন জেলায় অনেক বড় স্থাপনা ছাড়াও ঢাকার এমপি হোস্টেল, লেক, সেকেন্ড ক্যাপিটালের মতো বড় বড় স্থাপনাতে তার প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে। 

গীতিকার, গীতিকবি ও সাহিত্যিক সাবির আহমেদ চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ২২। তার জীবন-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লেখক-গবেষক ২৪টির বেশিও বেশি বই লিখেছেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইত্তেহাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ১৯৮৩ সালে নিজের সম্পাদনায় ‘জলসিঁড়ি’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন।

সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত আছেন সাবির আহমেদ। ঢাকার শান্তিনগরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘বাহার মেমোরিয়াল কমিটি’র তিনি অন্যতম সদস্য। ঢাকায় নজরুল সংগীত চর্চার জন্য ‘নজরুল একাডেমী’ প্রতিষ্ঠায় অর্থায়ন করেন তিনি। যুক্ত ছিলেন ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ’ প্রতিষ্ঠাতেও। এ ছাড়াও ঢাকা, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অর্থায়ন করেছেন তিনি।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা