× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

টানা ৬ বছর সহ্যমাত্রার ১৩ থেকে ১৯ গুণ বেশি দূষণ

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৪ ১০:৪৬ এএম

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৪ ১১:১৮ এএম

টানা ৬ বছর সহ্যমাত্রার ১৩  থেকে ১৯ গুণ বেশি দূষণ

নানা কর্মসূচি নিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না দেশের বায়ুদূষণের মাত্রা। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার বায়ুমানের অবস্থা করুণ। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকার বায়ুমান থাকছে মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে। বায়ুদূষণে ২০২৩ সালে দেশ হিসেবে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। আর নগর হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ দূষিত নগর ছিল ঢাকা। নগরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। 

মঙ্গলবার (১৯ মার্চ) সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের ‘বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন ২০২৩’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান পিএম ২.৫ বা অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপাদান ধরে এই বায়ুমান নির্ণয় করা হয়েছে।

এতে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার (পিএম ২.৫) উপস্থিতি ছিল ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডের চেয়ে অন্তত ১৬ গুণ বেশি। দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় বাংলাদেশের পরই আছে পাকিস্তান। দেশটির বায়ুতে ২০২৩ সালে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ছিল ৭৩ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম। ডব্লিউএইচওর মতে, বাতাসে পিএম ২.৫ থাকা উচিত মাত্র ৫ মাইক্রোগ্রাম। বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত ৬ বছরে অর্থাৎ ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বায়ুদূষণের মাত্রা ডব্লিউএইচওর মানদণ্ডের চেয়ে ১৩ থেকে ১৯ গুণ পর্যন্ত বেশি থাকতে দেখা গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯ গুণ ছিল ২০১৮ সালে। ওই বছরে বাংলাদেশের বাতাসে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ছিল ৯৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৯ সালে যা ছিল ৮৩.৩ মাইক্রোগ্রাম।

এ ছাড়া ২০২০ সালে ৭৭.১ মাইক্রোগ্রাম, ২০২১ সালে ৭৬.৯ মাইক্রোগ্রাম ছিল পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি। ২০২২ সালে এর মাত্রা ছিল ৬৫.৮ মাইক্রোগ্রাম। যার তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বাতাসে বৈশ্বিক মানদণ্ডের চেয়ে ১৬ গুণ বেশি মাত্রায় পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি দেখা গেছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের দূষিত বাতাসের দেশের তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে ছিল।

বায়ুমান গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, দেশ হিসেবে বায়ুদূষণে বাংলাদেশ যে শীর্ষ স্থান তা আমাদের জন্য বিপদের সংবাদ। তবে প্রতিবেদনে পিএম ২.৫-এর যে বিষয়টি বলা হয়েছে; সেটি আমাদের স্বাস্থ্য এবং জলবায়ুÑ দুয়েরই জন্য ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কণাগুলো ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে থাকে। এতে মানুষের ফুসফুস, হার্ট, কিডনি, রক্তে, মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। আর পিএম ২.৫-এর মধ্যে যে রাসায়নিক বস্তু থাকে তা তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়; এতে গরম বেশি অনুভূত হয় এবং জলবায়ুতে প্রভাব ফেলে থাকে।

নগর হিসেবে দূষণের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকার বায়ুতে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ছিল ৮০ দশমিক ২ মাইক্রোগ্রাম। আর এ তালিকায় শীর্ষে থাকা নয়াদিল্লির বাতাসে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ৯২ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম।

আইকিউএয়ার জানিয়েছে, ২০২৩ সালে শুধু অস্ট্রেলিয়া, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, গ্রেনাডা, আইসল্যান্ড, মরিশাস ও নিউজিল্যান্ড বায়ুমানের দিক থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড বজায় রাখতে পেরেছে। ১৩৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার নজরদারি স্টেশন থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইকিউএয়ারের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ২০২২ সালে বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল আফ্রিকার সাহিল অঞ্চলের দেশ চাদ। কিন্তু গত বছর দেশটি থেকে কোনো তথ্য না আসায় সর্বশেষ তালিকাতেই নেই তাদের নাম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন্যতম অংশীদার সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের কর্মকর্তা ক্রিস্টি কেস্টার জানান, সাধারণত উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বাতাসে পিএম ২.৫ বস্তুকণার উপস্থিতি বেশি থাকে। দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে দেশগুলোর ঘনবসতি, কৃষি ও কারখানা উৎপাদন ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, এটা দুঃখজনক যে, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যার হার, কৃষি ও শিল্পোৎপাদনের ধরন রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ কারণে শিগগির এসব দেশের বাতাসের মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম। 

আইকিউএয়ারের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বায়ুদূষণের জন্য মূলত ইটভাটা এবং যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বায়ুর গুণমানকে প্রভাবিত করে এমন অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে ধূলিকণা, কারখানা, গৃহস্থালি, রান্নার স্টোভ, প্লাস্টিকের আবর্জনা পোড়ানো এবং লাইনবিহীন ল্যান্ডফিল। এছাড়া আন্তঃদেশীয় বায়ুদূষণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ভারত ও নেপালের ধোঁয়া দূষণ এবং পাকিস্তানে ফসল পোড়ানোর মৌসুমে দূষিত বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে।

তবে বৈশ্বিক এই প্রতিবেদনে ইটভাটার দূষণকে বিশেষভাবে তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্মাণ খাতে ইট একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ন ইটের চাহিদা যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি ব্যাপক বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করেছে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুষ্ক মাসগুলোতে অনানুষ্ঠানিক ইট উত্পাদন হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ সারা দেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা চালু রয়েছে। অধিকাংশ ভাটা অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে আইন করার পরও বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশ ভাটা মানুষের বসতভিটার এক কিলোমিটারের মধ্যে। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ও ইট উৎপাদনকে দেশের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকেই বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো বন্ধ করতে আমরা পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছি। এরই মধ্যে প্রায় চারশ ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি দূষণের আরেকটি উৎস বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণসামগ্রী ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বায়ুদূষণ আমরা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে পারব।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে এখনও কয়েক শতাধিক অবৈধ ভাটা বৈধতার লাইসেন্স পেয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যেগুলো থেকে দূষণ বাড়ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময় ঢাকার আশপাশের কৃষিজমিগুলোতে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। যেগুলো স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিস ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ছাড়পত্র পেয়েছে। পরে এই ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিয়ে বাগিয়ে নিয়েছে ইটভাটার বৈধ লাইসেন্সও। অথচ ওইসব ইটভাটা কখনোই লাইসেন্স পাওয়ার কথা ছিল না। এছাড়া অবৈধ ইটভাটাকে বৈধ করতেও প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের চাপ রয়েছে।   

বায়ুমণ্ডলীয় অধ্যয়ন কেন্দ্র- ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও বায়ুমান গবেষক আহমাদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত কারণে দূষণের পরিমাণ কমছেই না। প্রাকৃতিকভাবে এখনও বাংলাদেশে দূষণ কমানোর মাধ্যম বৃষ্টিপাত। তবে এখন প্রকৃতির ওপর এই নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে বায়ুদূষণ যাতে বেড়ে না যায়, সে উদ্যোগগুলো নিতে হবে। এজন্য ইটভাটা কমানো ও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বর্জ্য না পোড়ানো, যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী না রাখা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গাড়ির কালো ধোঁয়া কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব অবৈধ ইটভাটা বৈধ করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যায়ভাবে বা প্রভাব খাটিয়ে কেউ অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা