× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বাগত ২০২৪

সবার আগে সুশাসন

মোফাজ্জল করিম

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৪ ১০:৩৩ এএম

মোফাজ্জল করিম

মোফাজ্জল করিম

স্বাগত ২০২৪। এই আহ্বান প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে পরিসীমায় ব্যাপৃত। গত বছর (২০২৩) আমরা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটের মধ্যে কাটিয়েছি এবং বলতে গেলে এসব সঙ্গে নিয়েই বরণ করছি নতুন বছর।

সংকটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। সংকট প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট- এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক সংকটের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু মনুষ্য সৃষ্ট সংকটের হিসাব আলাদা। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। এই সংঘাত সহজেই থামানো সম্ভব। কিন্তু থামছে না। কেউ নিরীহ মানুষের মৃত্যু থামাতে উদ্যোগ নিচ্ছে না। যুদ্ধের নামে নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিচারে মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে না কেউই, এমনটি সভ্যতা  মানবতার কলঙ্ক নয় কি? একই কথা বলা যায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বেলায়ও। বছরজুড়ে চলা এই যুদ্ধের ভয়াবহতাও সুদূরপ্রসারী। ইতোমধ্যে এই যুদ্ধের ক্ষতের জ্বালায় ভুগতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকে। অর্থনৈতিক যে সংকট বিশ্বকে তাড়া করছে এর পেছনেও সঙ্গত কারণে দায়ী করা হচ্ছে এই যুদ্ধকেই।


বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশের মতো আমাদের দেশেও বিগত বছরজুড়েই রাজনৈতিক সংকট পিছু তাড়া করেছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে হরতাল-অবরোধ-জ্বালাও-পোড়াও প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আর দেশ-বিদেশের নানামুখী সংকটের সঙ্গে জীবনকে মিলিয়ে নিতে নিতেই শুরু হলো নতুন বছর। বছরের প্রথম সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শর্তহীন সংলাপে বসা উচিত ছিল। শর্তহীন সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করার তাগিদও নানা মহল থেকে ছিল। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট অনেকাংশে দূর করা দুরূহ কিছু ছিল না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন এক ধরনের ‘অপসংস্কৃতি’ জিইয়ে রয়েছে যেখানে পরমতসহিষ্ণুতার কোনো ঠাঁই নেই। সন্দেহ নেই আমাদের সমস্যা-সংকটের উৎস বলতে গেলে সেটিই।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে ততই জনমনে শঙ্কা বেড়ে চলেছে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক শিবির দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং অন্য অংশ নির্বাচন বর্জন করছে। অতীতে একাধিক নির্বাচন নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কী কী ত্রুটি ও ঘাটতি বিদ্যমান এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার তো বটেই আমাদের অনেকেরও ধারণা রয়েছে। এই ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা ঘাটতির বিষয়গুলো কীভাবে পূরণ করা যায় এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনাসাপেক্ষে সমাধানে পৌঁছতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, সেই সুযোগ আমরা হারিয়েছি। ফলে বেড়েছে রাজনৈতিক সংকট। মানুষকে উৎকণ্ঠা নিয়ে সময় পার করতে হচ্ছে। তারপরও আমার মনে হয়, সময় সব শেষ হয়ে যায়নি। ভবিষ্যৎ নিরাপদ ও জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে রাজনৈতিক অনৈক্য ঘোচানোর জন্য আলোচনার টেবিল বর্জন না করাই শ্রেয়।  

তবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে জিইয়ে থাকা প্রতিবন্ধকতাগুলোর নিরসনে অনেক আগে থেকেই আমাদের আন্তরিকতার সঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। বিদ্যমান সংকটের স্বরূপ আমাদের অনুধাবন করতে হবে। অর্থাৎ সংকটের স্বরূপ অনুধাবনের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব কীভাবে এই সংকটাবস্থা থেকে বের হওয়া যাবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাশকতার ছায়া দৃশ্যমান। নাশকতা সামনে আরও বাড়বে বলেই নানা মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জাতিকে সংকটাবস্থা থেকে বের করে আনা। সারা বছর যে ছাত্র লেখাপড়া করে না, সেই ছাত্রও পরীক্ষার আগের রাতে মনোযোগী হয়ে ওঠে। এক রাতে যতটুকু প্রস্তুতি সম্ভব সে তা নিয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সেই ন্যূনতম প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

রাজনীতিকদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। দেশ-জাতিকে সংকটমুক্ত কীভাবে করা যায়, এ বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে। দায়িত্বশীলদের ভুলে গেলে চলবে না, দেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই সংবিধান রচিত হয়েছে। সংবিধানের ধারক-বাহক হিসেবে সাংবিধানিকভাবে পথ মসৃণের দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের সচেষ্ট হতে হবে। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তাদের কাজ করতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট জনজীবন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা সংকটের মধ্যে নিপতিত জনজীবন। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ঐক্যের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থ নয় বরং দেশের মানুষের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিতে হবে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু দৃশ্যমান সাফল্য তাতে মেলেনি। রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের বদলে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার পথ মসৃণ করার লক্ষ্যে কাজ করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিষয়টি যেন বারবার উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন যারা কিংবা যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেতে আগ্রহীÑ এ দুই পক্ষের তরফেই আমরা উপেক্ষার মনোভাব দেখতে পাচ্ছি। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষকে সমন্বয় করতে হচ্ছে। ব্যয় তালিকা সংকোচন করতে হচ্ছে। যেখানে পেঁয়াজের দাম ২০-৩০ টাকা হওয়ার কথা সেখানে পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা হওয়র পরও অনেকেই বিস্মিত হইনি। এ তো গেল একটি পণ্যের কথা। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও হুহু করে বাড়ছে। অথচ দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কারও যেন কোনো ধরনের ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? উত্তর, জনস্বার্থ নিয়ে যারা ভাববেন তাদের জীবনকে মনে হয় মূল্যবৃদ্ধি তেমনভাবে প্রভাবিত করছে না।

অনুমানের ভিত্তিতে বলা যায়, রাজনৈতিক অঙ্গনের কারও কারও সঙ্গে সিন্ডিকেটের যোগসূত্র রয়েছে। সিন্ডিকেটের কথা মুখে বলা হচ্ছে অথচ সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে না কেনএমন প্রশ্ন বারবার উঠছে। এরকম অপরাধীদের কারও দৃষ্টান্তযোগ্য সাজা হয়েছে এমন খবর এখনও মেলেনি। আবার বাজারে সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা দূর করতে কোনো সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও আন্দোলন করতে দেখা যাচ্ছে না। বলে নেওয়া ভালো, অনাহারক্লিষ্ট মানুষ সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নামলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তখন ক্ষমতার অপব্যবহার করেও এমন সংকট নিরসন করা যাবে না। টিয়ার গ্যাস কিংবা বুলেট ছুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করা যায়, কিন্তু জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে যে আন্দোলন শুরু হয় তা দমিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে স্বস্তি দিতে অবিলম্বে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ব্যবস্থার ফাঁক-ফোকরে যারা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশ্বের সব দেশেই মূল্যস্ফীতি কমবেশি রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। যে বা যারা এর পেছনে দায়ী তাদের খুঁজে বের করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। অন্তত কিছু ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি আর সময়ক্ষেপণ না করে। দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে দৃষ্টান্তযোগ্য দৃষ্টান্ত প্রয়োজন। এভাবেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো জরুরি। আমাদের অর্থনীতি অনেক এগিয়েছে। কিন্তু তাই বলে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যেসব ঘাটতি রয়েছে সেসব বিষয় সম্পর্কে ভোক্তাকে অবহিত করা জরুরি। ভোক্তার সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক, মধ্যবর্তী ও দূরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি তা করা সম্ভব হয় তাহলেই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।

স্বাধীনতার পর দেশে দুটি পক্ষ সৃষ্টি হয়েছেÑ একটি ক্ষমতাসীন পক্ষ, অপরটি বিরোধী পক্ষ। এই দুটো পক্ষ পৃথিবীর সব প্রান্তেই রয়েছে। তবে আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট তীব্র। রাজনৈতিক দলগুলো যদি দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের বদলে দেশ-জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তাহলে রাজনৈতিক সংকট দূর করা কঠিন নয়। দেশ-জাতির স্বার্থের চেয়ে বড় তো কিছু হতে পারে না। সংকট আমাদের বহুমাত্রিক। বৈষম্য-অনিয়ম-দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার সত্ত্বেও এগুলো কমছে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ছে। এজন্য সর্বাগ্রে জরুরি সুশাসন নিশ্চিত করা। সুশাসন ব্যতীত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হবে না। সুশাসন নিশ্চিত হলে অনেক কিছুই হবে জনপ্রত্যাশার পরিপূরক। নতুন বছরে এ আশা পূরণ হোক।

সাবেক সচিব ও কবি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা