× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্র পরিচালনা

দৃষ্টি ফেরাতে হবে যেদিকে

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ ১৪:৩৭ পিএম

দৃষ্টি ফেরাতে হবে যেদিকে

৭ জানুয়ারি ২০২৪ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থবার মোট পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করায় প্রথমেই জানাই অভিনন্দন। পরপর তিনবার প্রধানমন্ত্রী থেকে তিনি দেশের আর্থসামাজিক যে উন্নয়ন সাধন করেছেন, যোগাযোগব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে, সারা পৃথিবীতে ধর্মীয় উগ্রবাদ যেভাবে মাথা চাড়া উঠেছে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এটাকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য।  করোনাকালে পৃথিবীতে যে অর্থনৈতিক সংকট ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল সে অবস্থা থেকে এ দেশের মানুষকে রক্ষা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন সে কারণে দেশের মানুষ তাকে মনে রাখবে। সর্বোপরি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের এ-দেশি দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। এ হত্যাকারীরা এ দেশে গাড়িতে যখন পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, তখন শহীদ পরিবারগুলোর অস্ফুট আর্তনাদের ভাষা তিনি অনুধাবন করেছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করবেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক চাপ উপেক্ষা করে তাদের বিচার করেছেন। এ দেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা মঞ্চে স্টেনগান রেখে জনসভা করেছে এবং সদম্ভে বলেছে, ‘আমরা শেখ মুজিবকে খুন করেছি’। তিনি এই আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের আওতায় এনেছেন এবং অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এ বিচারকার্য সম্পন্ন করেন। এ দেশে তার ওপরে অনেকবার হামলা হয়েছে, তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তিনি সমাজে সত্য-সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত হননি। মানুষের আকাঙ্ক্ষার, প্রত্যাশার বা চাওয়ার কোনো শেষ নেই, তার পরও এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর পরে এ দেশে তিনিই একমাত্র সরকারপ্রধান যিনি এ দেশের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কে ধারণা রাখেন। সংবাদমাধ্যমের খবর দেখে অনেক বিষয়ে ব্যবস্থা নেন। তার অর্থ তিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আছেন। করোনার অভিঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য বৈশ্বিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি সবারই জানা। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা নিজেরা দাম বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি ১২০ টাকার পেঁয়াজ এক রাতের মধ্যে ২২০ টাকা হয়ে যায়। এ বিষয়টি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে; কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না মানুষ জানে না। দুই মাস আগে কলকাতায় ডিম খেয়ে এলাম ২০ টাকা হালি, অথচ রাজশাহীতে এসে দেখলাম ৪৫ টাকা। কিন্তু যারা বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত তাদের কেউ চেনে না। চেনে শুধু শেখ হাসিনাকে। তিনি ভালো করলে আমরা তার প্রশংসা করি না, অথচ অন্য কেউ খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দোষ পড়ে তার ঘাড়ে। বর্তমানে সত্যিকার অর্থেই নিম্ন ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ কষ্টে আছে। এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সজাগ বলেই হয়তো মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ আমরা দেখতে পাই। করোনাকাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ব্যাংকব্যবস্থায় যে শৃঙ্খলা ছিল সংবাদমাধ্যমের খবর দেখে মনে হয় এটি কিছুটা বিশৃঙ্খল হয়েছে। যিনি নতুন অর্থমন্ত্রী তিনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ বলে মনে হয়। কারণ ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালি কূটনীতিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম বাংলাদেশের পক্ষে ডিফেক্ট করেছিলেন। তিনি পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নিয়েও তখন এতটা চিন্তা করেননি। ব্যাংকের ঋণসমূহ যথাযথভাবে আদায় ও নতুন ঋণদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিয়ম অনুসরণের জন্য তিনি ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করবেন বলে বিশ্বাস করি। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক কথা হয়। আমরা বুঝে বা না বুঝে কথা বলি। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো একনেকে যাওয়ার আগে কয়েক দফা পরীক্ষানিরীক্ষা চলে। প্রতিটি পর্যায়েই বিশেষজ্ঞরা থাকেন। তার পরও এ বিষয়ে বিস্তর কথা চলে। তবে কিছু কিছু প্রকল্পে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় হওয়ার কারণে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প ছাড়া অধিকাংশ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সাহস নিয়ে খরচের ব্যাখ্যাগুলো জাতির সামনে উপস্থাপন করেননি। তা হলে কথা বলার সুযোগ কমে যেত। নবনিযুক্ত পরিকল্পনামন্ত্রী এ বিষয়ে তৎপর থাকবেন বলে আমরা মনে করি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নতুন কারিকুলাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কথা হচ্ছে। হয়তো যারা সবকিছুর বিরোধিতা করে তারা এ কারিকুলাম নিয়েও বিরোধিতা করছে। তবু একবার খতিয়ে দেখা যায় আসলেই কোনো সমস্যা আছে কি না। এ বিষয়ে অবশ্য ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী কথা বলেছেন। যখন ফলাফল বিভাগ থেকে জিপিএ পদ্ধতিতে এলো, আবার যখন পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা উঠে গেল তখন কিছু মানুষ হইচই করেছে। পরে আবার সবই আত্মস্থ করেছে।

তিনি নির্বাচনের অনেক আগে থেকে বলে আসছিলেন এবারের জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে। সমগ্র বিশ্ব এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সরকারের সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন তা করে দেখিয়েছে। নির্বাচনের সময়সীমা স্বল্পসময় বাকি থাকতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসনের একজন প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। টেলিভিশনের টকশোয় অনেকে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে থাকলে কমিশন এটি করতে পারত কি না। মনে হয় সেটি কমিশনের দ্বারা অবশ্যই সম্ভব হতো। কারণ তাদের সেই দৃঢ়তা ছিল। আমরা লক্ষ্য করেছি প্রধান নির্বাচন কমিশনার অনেক বিষয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্যত্র। তা হলো বহু জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্বাচনের পরে সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও তা বিদ্যমান। বহু জীবন এর মধ্যে ঝরে গেছে। নোয়াখালী-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্ট শাহেদ আলী পলাশকে ১৩ জানুয়ারি খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সাংঘর্ষিক অবস্থার একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক ফল রয়েছে। এ বিবাদ দ্রুত নিরসন করা না গেলে সমাজে বড় ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করবে এবং নতুন জীবননাশের পাশাপাশি রাষ্ট্রও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। থানা-পুলিশ করতে করতে মানুষের মধ্যে হিংসা বিস্তৃত হবে এবং এর কুফল পড়বে রাজনীতিতে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগই এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে সরকারের ভালো কাজের পক্ষে প্রচারের কর্মী কমে যাবে এবং অনেকে বিরোধীদের সঙ্গে হাত মেলাবে। ফলে ভবিষ্যৎ আন্দোলন-সংগ্রামেও সমর্থক হ্রাস পাবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও দলটিকে এক ধরনের আন্দোলনের মধ্যে থাকতে হয়। যেমন যুদ্ধাপরাধের বিচারের সময় এ আন্দোলন করতে হয়েছে। জামায়াত-হেফাজতের ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়েছে, এমনকি ২০১৪-পরবর্তী এবং সাম্প্রতিক বিএনপির আগুনসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কর্মীদের মাঠে নামতে হয়েছে। তাই এখনই প্রান্তিক পর্যায়ের এ সাংঘর্ষিক ও সংঘাতময় অবস্থা থেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের বের করে আনা জরুরি। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ হারলে বাংলাদেশ হারে’। তাই আওয়ামী লীগের মতো সংগঠন যদি বিবাদের কারণে দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটি দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।

বাংলাদেশের যুবসমাজ যাতে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয় সে বিষয়ে তার নিরন্তর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। তিনিই ছাত্রসমাজকে সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই। সন্ত্রাসের কারণে এখন এর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে মাসের পর মাস অনির্ধারিত ছুটি থাকে না। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্যত্র। দেশের আর্থিক অবস্থা ভালো হওয়ার কারণে আমরা অনেক শিক্ষকও যেনতেন প্রকারে টাকার মালিক হতে চাই। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। অগণতান্ত্রিক শাসকরা এ দেশে শিক্ষার্থীদের নগদ অর্থ দিয়ে তাদের পক্ষে স্লোগান দেওয়ার জন্য রাজনীতিতে নামিয়েছে। তখন থেকে ছাত্ররাজনীতির নৈতিক মান কমতে থাকে। এখন যারা রাজনীতি করছেন এবং তারা কেন করছেন তার উত্তর তাদের জানা নেই। কেন ছাত্রলীগ করি অধিকাংশই তার উত্তর দিতে পারে না। বাংলা, বাঙালি, বাঙালিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা বা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা নেই। এমনকি যুবসমাজের জন্য শেখ হাসিনা সরকারের কী কর্মসূচি রয়েছে সে সম্পর্কেও তারা ততটা ওয়াকিবহাল নয়। তাই একটি স্মার্ট প্রজন্ম তৈরি করা বেশ দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে টিকে থাকা কষ্টকর হবে। আমাদের এটি অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন, আজ বিএনপি নির্বাচনে না এলেও ভবিষ্যতে অর্থাৎ পাঁচ বছর পরে আসবে। তখন পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন থাকবে তা অনুমান করা কষ্টকর। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি অনেকটা পেছনের দিকে চলে গেলেও বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ বিরোধী লোক এ দেশে থাকবে। তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য একটি প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী প্রয়োজন যারা আদর্শিকভাবে বাংলাদেশ ধারণ করে। এমনকি ধর্মীয় উগ্রবাদীদের শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে মোকাবিলা না করে ধর্মীয়ভাবেই তাদের মোকাবিলা করা যায়। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনও জরুরি। আর তা বাস্তবায়ন করতে গেলে আপাত সাংঘর্ষিক অবস্থা নিরসন ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। 


  • রাজনীতি-বিশ্লেষক। অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা