× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

শিক্ষাঙ্গন নিপীড়কের চারণভূমি হতে পারে না

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৩:৩১ পিএম

শিক্ষাঙ্গন নিপীড়কের চারণভূমি হতে পারে না

শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয় তাহলে শিক্ষাঙ্গন সেই মেরুদণ্ড তৈরির নিঃসন্দেহে উর্বর জমিন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রায় সব স্তরের শিক্ষাঙ্গনেই যৌন নিপীড়ন-নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের নিগ্রহ এবং নিগ্রহকারী হিসেবে শিক্ষকের নাম উঠে আসা শুধু গভীর উদ্বেগেরই নয়, একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষাঙ্গন কেন কদাচারের চারণভূমি হয়ে উঠছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির যে চিত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ উঠে এসেছে তা আমাদের ক্ষুব্ধ না করে পারে না। ভিকারুননিসায় আরেক ‘পরিমল’ শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদনের গর্ভে যে চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে তা রীতিমতো ভয়াবহ। আমরা জানি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের খ্যাতির সীমানা কম বিস্তৃত নয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি নেতিবাচক অর্থে বহুবার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, এ-ও সত্য। আমরা জানি, এই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক পরিমল ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। একই প্রতিষ্ঠানে তার মতো আরও একজন নিপীড়কের নাম উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ঢাকার আজিমপুর শাখার গণিতের শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের অনৈতিক কর্মকাণ্ড এ প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিষাধার হয়ে উঠছে কেন?


ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আজিমপুর শাখার শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে দুজন শিক্ষার্থী শিফট-প্রধানের কক্ষে প্রতিষ্ঠানটির অন্য শিক্ষকদের উপস্থিতিতে সম্ভ্রম বাঁচানোর আর্তনাদ করেছেন। আমরা অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের প্রতি ধিক্কার জানানোর পাশাপাশি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রশ্ন রাখতে চাই, শিক্ষাঙ্গনে অনাচার-দুরাচারের হোতাদের খুঁটির জোর কোথায়? কোচিংয়ে নিয়ে গিয়ে কৌশলে মুরাদ যৌন নির্যাতন করেন এবং নির্যাতিতাকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনা না প্রকাশের হুমকিও দেন। এর আগে মুরাদের বিরুদ্ধে অন্য কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র থেকেও আপত্তিজনক অভিযোগ উঠেছিল, এও ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদককে কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, শিক্ষক মুরাদকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ! তদন্ত কমিটির সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও সংগতই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ অভিযোগ জানানোর দুই সপ্তাহ অন্তিমেও তারা ভুক্তভোগীদের হুমকিধমকি দেওয়া ছাড়া তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ।

পুরো ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গলদ রয়েছে গোড়ায় এবং শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করার হোতারা প্রতিপালিত হন বটবৃক্ষের ছায়ায়! আমরা জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের নামই উঠে এসেছে যৌন নিপীড়ক হিসেবে। কথায় আছে, মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে। আমরা মনে করি, মুরাদদের অভিযোগের পরও যারা তাদের প্রতিপালন করেন এই দৃষ্টিকোণ থেকে কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এই ব্যভিচারের দায় এড়াতে পারে না। নিপীড়ন-নির্যাতনের অন্ধকারে শিক্ষাঙ্গন নিমজ্জিত হবে এমনটি কোনো সভ্য কিংবা মানবিক সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এ-ও জানি, রাজনীতির নামে অপরাজনীতির ছায়া শিক্ষাঙ্গনগুলোকে কলুষিত করার জন্য বহুলাংশে দায়ী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিগ্রহের মতো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নানা পর্যায়ে সরব প্রতিবাদের পরও এমন ঘটনা শুধু মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে আসে না, একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার ছায়া কী ভয়াবহভাবে সর্বব্যাপী হয়ে পড়ছে এরও সাক্ষ্য মেলে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এমন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক অনুশাসনের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা মনে করি, এটুকুই যথেষ্ট নয়। শিক্ষাঙ্গনে বারবার যৌন নিপীড়নের ঘটনা যে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে এর দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দপ্তর-অধিদপ্তর কোনো পক্ষেরই এড়ানোর কোনো অবকাশ নেই এবং এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করার দায় তাদেরই।

সুনীতি-সুআচারের অধিকতর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেখানে একজন শিক্ষার্থী পরিশীলিত হয়ে দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার হিসেবে পরিগণিত হবে সেখানে এ রকম কদাচার আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন ফিকে করে দেয়। শিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়ন-নির্যাতনরোধে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্দেশনায় বলা হয়, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও কমিটি গঠনের। প্রশ্ন হচ্ছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুসারে প্রতিরোধ কমিটি কী করছে? বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাঙ্গনে কীভাবে মুরাদরা বেড়ে উঠছে এর উৎসে নজর দিয়ে প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীলদের কেন এত গড়িমসি? নারীর অবমাননার বিষয়টি কেনই বা সামাজিক অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে না, আমরা এই প্রশ্নও রাখি। একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানই করেন না, তিনি তার শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষকদের মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু নিম্ন থেকে একেবারের উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন-নির্যাতনসহ নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ যেভাবে উঠছে তাতে শুধু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনই হুমকির মুখে পড়ছে না, সমাজেও অবক্ষয়ের থাবা বিস্তৃত হচ্ছে।

আমরা আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি গঠন এবং এর দৃশ্যমান কার্যকর ভূমিকা দেখতে চাই। সিলেবাসের পাঠ্যসূচির বাইরে শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের তারা যখন ঘৃণ্য কাজে জড়িয়ে পড়েন তখন শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্বের বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। যৌন হয়রানির চাপা কষ্ট নিয়েই শেষ হয় অনেকের শিক্ষাজীবন এবং ৯০ শতাংশ ভুক্তভোগীই মানসম্মান কিংবা বলবানদের ভয়ে মুখ খোলে না এই তথ্যও সংবাদমাধ্যমেরই। আরও অভিযোগ আছে, শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির অনেক অভিযোগ রাজনৈতিক প্রভাবে চাপা পড়ে যায়। গত বছরের জুনে মহিলা পরিষদ আয়োজিত এক সেমিনারে এই তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছিল, শিক্ষাঙ্গনের প্রধানের ওপর যৌন নিপীড়নের বিচার পাওয়া-না পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। আমরা দেখছি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক মুরাদ হোসেনের ক্ষেত্রে যেন তা-ই ঘটছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে নিপীড়কদের মূলোৎপাটন করতেই হবে। দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধও। একই সঙ্গে সন্ধান করতে হবে শিক্ষাঙ্গনকে কারা অপরাধের অভয়ারণ্য করে তুলছে। আমরা ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক মুরাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের যথাযথ প্রতিকারের মধ্য দিয়ে অন্ধকারের ছায়া সরাতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সব পক্ষ দ্রুত তৎপর হয়ে উঠেছে তা দেখতে চাই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা